প্রাণের মানুষ কালিকা প্রসাদ

Kalika Prosad

আমার বাংলা নিউজ ডেস্ক, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য একজন ভারতীয় বাঙালি লোকসঙ্গীত শিল্পী ও লোকসঙ্গীত গবেষক। তিনি আসামের শিলচরে জন্মগ্রহণ করেন ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০সালে। আসামের শিলচরে ভট্টাচার্য বাড়িই ছিল তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রাথমিক অংশ। তিনি তাল এবং সুরের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তবলা বাজানোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি সুরের জগতে প্রবেশ করেন। তবলার পরে ধাপে ধাপে অন্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন।

তিনি কণ্ঠ সঙ্গীতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। গান তাঁর গভীর আগ্রহের বিষয় ছিল।অবশেষে তিনি উত্তরবঙ্গের ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপরেই ঐতিহ্যবাহী লোকগানের সন্ধান শুরু করেন যা স্পন্দনশীল, সুমধুর এবং সর্বজনীন লোকসুর, যা ছিল অনেকের অচেনা এবং অজ্ঞাত। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যে অধ্যয়ন করেন। তাঁর সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান শুনে বড় হওয়া। ছোটবেলা থেকেই মন ছুটত টুসু, ভাদু, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি সুরের উজান বাওয়া গান শুনতে শুনতে একসময় মনে হল জোট বাধা দরকার। 

১৯৯৮ সালে “ইন্ডিয়ান ফাউন্ডেশন অফ দি আর্টস” থেকে শিল্প লোকসঙ্গীত এর ওপর গবেষণার জন্য অনুদান পেয়ে ব্যাঙ্গালরে চলে যান। ১৯৯৯ সালে, তিনি উত্তরবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের পল্লীগান ও লোকায়ত গানের ঐতিহ্যকে পুনর্জাগরণের উদ্দেশ্যে লোকগানের ব্যান্ড তৈরি “দোহার” করলেন। এটি একটি লোকসঙ্গীতের দল, লোক গানগুলি তার সৃষ্টিশীল দিক নিয়ে, অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তিনি কাজ করেছিলেন। কালিকা প্রসাদের আদিবাড়ি আসামের শিলচর হলেও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম টান ও ভালোবাসা। বাংলাদেশের যে কোন অনুষ্ঠানে ডাক পেলেই ছুটে গিয়েছেন, মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন দুই বাংলার। তাঁর দোহারের উপস্থাপনা ছিল স্বতন্ত্র। তাঁর কর্মক্ষমতায় আছে আশ্চর্যজনকভাবে শহুরে অনুভূতি একত্রিত করার ক্ষমতা। তাঁর গানগুলো একই সাথে গবেষণা এবং বিনোদনময়। ইতিমধ্যে কালিকার পরিচালিত দোহার লোকগানের অনেক রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে।

কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে কয়েকটি প্লেব্যাক গান গেয়েছিলেন। অশোক বিশ্বনাথের পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্র গুমশূদাতে তার গান ছিল। ২০০৭ সালে তিনি সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র চুতুরঙ্গের জন্য গান গেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে মনের মানুষের (সোনালি ময়ূর পুরস্কার বিজয়ী) জন্য গান গেয়েছিলেন, যা গৌতম ঘোষের পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রচেষ্টা। এটি ফকির লালন শাহের জীবন ও দর্শন নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া চলচ্চিত্র। বাংলা চলচ্চিত্র, জাতিশ্বর একটি জাতীয় পুরস্কার (রজত কমল) বিজয়ী চলচ্চিত্র ছিল, এটি শ্রীজিত মুখার্জির পরিচালনায় তৈরী হয়েছিল, যেখানে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ২০১৪ সালে গান গেয়েছিলেন। তাঁর শেষ ছায়াছবির কাজ ছিল ভুবন মাঝি।

২০১৩ সালে কালিকাপ্রসাদ তাঁর অনন্য সৃষ্টি এবং বাদ্যযন্ত্র শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার “সংগীত সম্মান পুরস্কার” দেন। তিনি ২০১৩ সালে গুয়াহাটির ব্যতিক্রম গ্রুপের কাছ থেকে উত্তর পূর্ব সাংস্কৃতিক পুরস্কারের রাষ্ট্রদূত উপাধি পান। তবে শুধু শিল্পী কালিকা প্রসাদ নন, ব্যক্তি হিসাবেও কালিকাপ্রসাদ ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ। নিজগুণেই তিনি তাঁর কর্মজীবনে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের মনের গভীরে কখন যে গেঁথে গিয়েছিলেন, তা তিনি হয়ত নিজেও জানতেন না। তিনি ২০১৭ সালের ৭ মার্চে হুগলী জেলার গুরাপ গ্রামের কাছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *